ফটোগ্রাফিক ম্যাথ

বর্তমান সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় ইলেকট্রনিক গ্যাজেট হলো ডিজিটাল ক্যামেরা, হোক সেটা কম্প্যাক্ট ডিজিটাল ক্যামেরা কিংবা ডিজিটাল এসএলআর। আধুনিক বিজ্ঞানের উৎকর্ষ, সবার হাতে হাতে শোভা পাওয়া এই যন্ত্রটি বানানো হয়েছে মানুষের চোখের গঠন এবং কার্যপ্রণালীর উপর ভিত্তি করে। তড়িৎচুম্বক বর্ণালির খুব ছোট এক অংশের কম্পাঙ্কের আলো দ্বারা আলোড়িত হয় আমাদের চোখ। অর্থাৎ এই নির্দিস্ট কম্পাঙ্কের বাইরের কোনো আলো আমরা দেখতে পাই না। আলো তথা ফোটন আমাদের চোখে পরলেই আমরা দেখতে পাই। বেশি ফোটন মানে বেশি আলো, তথা বেশি উজ্জলতা। ফোটনের পরিমাণ দ্বিগুণ হলে উজ্জলতা হয় দ্বিগুণ, ফটোগ্রাফির ভাষায় যাকে বলা হয় এক স্টপ (one stop) বেশি উজ্জল।

ডিজিটাল ক্যামেরায় এক্সপোজার অর্থাৎ আলোর প্রকটতা নিয়ন্ত্রণ করা হয় মূলত দুটি জিনিস (এছাড়াও আরও কিছু নিয়ামক রয়েছে) দিয়ে। এগুলো হলো শাটার স্পিড (Shutter Speed) এবং অ্যাপারচার (Aperture). শাটার স্পিড মূলত নিয়ন্ত্রণ করে কতক্ষণ সময় ধরে আলো অর্থাৎ ফোটন ক্যামেরার সেন্সর এর উপর পড়বে। শাটার স্পিড দ্বিগুণ করা হলে (যেমন ধরা যাক ০.৫ সেকেন্ড থেকে ১ সেকেন্ড) ক্যামেরার সেন্সর দ্বিগুণ পরিমাণ সময় নিয়ে আলো গ্রহণ করবে অর্থাৎ দ্বিগুণ পরিমান ফোটন ক্যামেরার সেন্সর এর উপর পড়বে। তাই শাটার স্পিড এর হিসাবটা বেশ সরলই বলা চলে। অন্যদিকে অ্যাপারচার এর হিসাব তুলনামূলকভাবে কিছুটা জটিল। আর আমার এ লেখা মূলত এটাকে ঘিরেই।
মানুষের চোখে আলোর প্রবেশ যেরকমভাবে নিয়ন্ত্রণ করে আইরিশ (Iris), তেমনিভাবে ক্যামেরার লেন্স এর ডায়াগ্রাম (diaphragm) বা মধ্যচ্ছদা ক্যামেরায় আলোর প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করে। আর মানুষের চোখের পিউপিল (pupil) এর মত করেই এই ডায়াগ্রাম এর মাঝে রয়েছে একটি ছিদ্র, যার মধ্যে দিয়ে আলো বা ফোটন সেন্সর এর উপর পড়ে। ক্যামেরার এই ছিদ্র টিকে বলা হয় অ্যাপারচার।

ক্যামেরার অ্যাপারচার এর এরিয়া দ্বিগুণ করা হলে, লেন্স এর মধ্য দিয়ে সেন্সরে ফোটন প্রবেশ করবার জায়গাও দ্বিগুণ হয়। ক্যামেরার ফোকাস দৈর্ঘ্য বা ফোকাল লেন্থ (Focal Length) এবং অ্যাপারচার এর ব্যাস এর অনুপাতকে প্রকাশ করা হয় একটি বিশেষ সংখ্যা দ্বারা। এই সংখ্যাটিকে বলা হয় এফ নম্বর (F-number). যেহেতু এফ নম্বর এর গণনাতে ক্ষেত্রফল বা এরিয়ার পরিবর্তে ব্যাস এর হিসাব চলে আসছে, তাই এর স্টপ গণনাতেও কিছুটা জটিলতা ঢুকে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে আমরা কেবল কোনো সংখ্যার দ্বিগুণ কিংবা অর্ধেক করেই স্টপ গণনা করতে পারব না।
F-number = f /D [f = ফোকাল লেংথ; D = ব্যাস]
অর্থাৎ এ থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে এফ নম্বর এর মান বাড়লে লেন্স এর মধ্য দিয়ে আলোর চলাচল কমে যায়। একটু চিন্তা করে দেখুন কি হতে পারে যদি ফোকাল লেংথ এর মান পরিবর্তন না করে ব্যাস এর মান পরিবর্তন করা হয় অথবা ব্যাস পরিবর্তন না করে ফোকাল লেংথে পরিবর্তন আনা হয়। উপরের ছবিটা লেন্স এর খুবই সরলীকৃত একটা ডায়াগ্রাম। আধুনিক সকল লেন্স এর ভিতরেই একাধিক গ্লাস রয়েছে, যার এক একটার ব্যাস এক এক রকম হতে পারে। এমনও হতে পারে যে লেন্স এর ভিতরের কোনো অংশ বা গ্লাস বাইরেরটার থেকে ছোট। তবে এগুলো ফোকাল লেংথ এর উপর কোনো প্রভাব ফেলে না।
যাইহোক, অ্যাপারচার এর এরিয়া দ্বিগুণ কিংবা অর্ধেক করলে এর মধ্যে দিয়ে প্রবেশকৃত আলোর পরিমাণও দ্বিগুণ অথবা অর্ধেক হয়। আবার এফ নম্বর এর সম্পর্কটা হলো লেন্স এর ব্যাসের সাথে, এরিয়া এক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ফেলে না। তাই প্রশ্নটা এসেই যায় যে এক স্টপ গণনা করবার জন্য এফ নম্বর এর পরিবর্তন তা কিরকম হতে হবে।
এই প্রশ্নটির উত্তর দেবার জন্য আমরা ধরে নেই আমাদের কাছে দুটি লেন্স রয়েছে যাদের এরিয়া যথাক্রমে A1 এবং A2

A1 এর এরিয়া A2 এর দ্বিগুণ। আরও ধরে নেয়া যাক A1 এর ব্যাস হলো d1 আর ফোকাল লেংথ f=১, তাই A1 এর এফ নম্বর হয় ১। আমরা আরও ধরে নেই আমাদের কাছে থাকা দুটি লেন্স এরই ফোকাল লেংথ সমান। A2 এর এফ নম্বর গণনা করবার জন্য আমাদের আগে বের করতে হবে এর ব্যাস A1 এর তুলনায় কতটুকু ছোট। চলুন কিছু হিসাব নিকাশ করে ফেলা যাক –

তার মানে A2 এর এরিয়া A1 এর তুলনায় অর্ধেক হলে, এর ব্যাস d2 হবে d1 এর sqrt(2)/2 গুণ অর্থাত d2=sqrt(2)/2 d1. আমরা জানি d1 এর ব্যাস হলো ১, তাই d2 এর ব্যাস হবে sqrt(2)/2 যার মান প্রায় ০.৭০। এভাবে হিসাব চালাতে থাকলে আমরা পাই –
দেখা যাচ্ছে যে A2 এর এফ নম্বর আমরা পাচ্ছি ১.৪। আরও বুঝা যাচ্ছে যে A1 এর এরিয়া A2 এর দ্বিগুণ হলেও d2 এর ব্যাস d1 এর ০.৭ গুণ। তাই এফ নম্বরও একই ভাবে প্রভাবিত হয়।
এভাবে যদি আমরা আরো গণনা চালাই যেমন A2 আর A3 (যার এরিয়া A2 এর অর্ধেক) নিয়ে এবং পরবর্তিতে এরকম আরো অর্ধেক অর্ধেক এরিয়া নিয়ে তবে আমরা এফ নম্বর এর একটি সারণী পেয়ে যাই-
এই নম্বরগুলো মনে রাখতে সমস্যা হলে শুধু প্রথম দুটি এফ নম্বর মনে রাখুন আর এর প্রত্যেকতাকে দ্বিগুণ করতে থাকলে আমরা পরবর্তী এফ নম্বর গুলো পেয়ে যাব।