কোয়ান্টাম বলবিদ্যা কথন- কি এবং কেন

বর্তমান সময়ের আধুনিক বিজ্ঞানের  খুব আলোচিত এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি শাখা হলো কোয়ান্টাম মেকানিক্স (Quantum Mechanics) বা কোয়ান্টাম বলবিদ্যা। কোয়ান্টাম বলবিদ্যা কারণ, প্রভাব, বাস্তবতা, অবস্থান, গতি ইত্যাদি সম্পর্কে আমাদের ধ্যান-ধারণাতে এক বিশেষায়িত পরিবর্তন এনেছে। আমাদের চারপাশের প্রাত্যহিক ঘটনাবলির ব্যাখ্যা পর্যন্তই দৌড় হলো চিরায়ত বলবিদ্যার (classical mechanics). আর কোয়ান্টাম বলবিদ্যার শাসন হলো অণু-পরমাণুর জগতে। যে জগতে প্রচলিত বলবিদ্যার ছড়ি ঘুরাবার কোনো জায়গা নেই, যেখানকার ঘটনাবলী ব্যাখ্যার জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞানের এক নতুন শাখার; কোয়ান্টাম বলবিদ্যা হলো সে জগতের বিজ্ঞান।

আমাদের চারপাশের ঘটনাবলীগুলো খুব সহজেই ব্যাখ্যা করা যায়  চিরায়ত বলবিদ্যার সাহায্যে, যেখানে বস্তু অবস্থান করে প্রসঙ্গ কাঠামোর (reference frame) একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ে। কিন্তু কোয়ান্টাম জগতে অর্থাৎ অণু-পরমাণুর দুনিয়ায় বিজ্ঞানের প্রচলিত অনুশাসন গুলো ভেঙ্গে পড়ে, এখানকার ঘটনাবলী অনুসরণ করে এক ভিন্ন নিয়মের। এ দুনিয়ায় বস্তুর (objects) অস্তিত্ব এক ধরণের অস্পষ্টতার মাঝে, এখানে সবকিছুই সম্ভাব্যতার দোলাচলে দোদুল্যমান।

কি —

কোয়ান্টাম তত্ত্ব কি এ বিষয়ে দুটি আলাদা বিবৃতি আছে। এগুলো হলো কোপেনহেগেন ব্যাখ্যা (Copenhagen Interpretation) ও বহু বিশ্ব তত্ত্ব (Many-World Thoery). বিজ্ঞানী নিল্স বোর কোপেনহেগেন ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তার বিবৃতি অনুসারে, সুনির্দিস্ট ভাবে একটি কণাকে (অথবা তরঙ্গ) কখনোই কোন নির্দিষ্ট বৈশিস্ট (যেমন, এটি কি কণা নাকি তরঙ্গ) কিংবা অবস্থা নির্ধারণ করে দেয়া যাবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না সেটাকে ঠিক মতো পরিমাপ করা হচ্ছে। বোর এর বিবৃতিকে অন্যভাবে বলা যায় যে আসলে বস্তুর বাস্তবিকতার কোনো অস্তিত্ব নেই। পরিমাপ করার আগ পর্যন্ত আমরা কখনই বলতে পারব না সেই বস্তুটি কি কণা নাকি তরঙ্গ। এর থেকে আমরা আরও একটি কথা বলতে পারি, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা বস্তুর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারছি ততক্ষণ পর্যন্ত সেটি যেকোনো অবস্থাতেই (কণা অথবা তরঙ্গ) থাকতে পারে। এটি superposition principle নামে পরিচিত।
বিষয়টিকে আর একটু বিশ্লেষণ করা যাক। এ প্রসঙ্গে শ্রুডিঞ্জার এর একটি বিখ্যাত থট এক্সপেরিমেন্ট (thought experiment) রয়েছে। এ পরীক্ষায় শ্রুডিঞ্জার একটি সীসার বাক্সের ভিতর একটি জীবন্ত বিড়ালকে কল্পনা করেন। এবার একটি শিশির ভিতর মরণঘাতী সায়ানাইড (cyanide) ভরে সেই শিশিটিকে বাক্সের ভিতর রেখে বাক্সটিকে বন্ধ করে দেয়া হলো। আমরা এখন জানি না বিড়ালটি কি আদৌ বেঁচে আছে নাকি শিশিটিকে ভেঙ্গে ফেলেছে এবং মারা গিয়েছে। যেহেতু আমরা জানি না সেহেতু বিড়ালটি জীবিত অথবা মৃত, একইসাথে যেকোনো অবস্থাতেই থাকতে পারে; কোয়ান্টাম বিধি অনুসারে যাকে বলা হচ্ছে সুপারপজিসন অবস্থা। আমরা যেই মুহুর্তে বাক্সটিকে ভেঙ্গে ভিতরে বিড়ালটির অবস্থা দেখবো, ঠিক তখনই বিড়ালটি জীবিত অথবা মৃত যেকোনো একটি অবস্থা ধারণ করবে এবং তখনই সুপারপজিসন অবস্থা বিনষ্ট হবে।

এবার কোয়ান্টাম তত্ত্বের দ্বিতীয় বিবৃতিতে আসা যাক, যাকে বলা হচ্ছে বহু বিশ্ব তত্ত্ব বা মাল্টিভার্স তত্ত্ব (multiverse theory). আমি এখানে সরাসরি বিবৃতিই উল্লেখ করে দিচ্ছি- as soon as a potential exists for any object to be in any state, the universe of that object transmutes into a series of parallel universes equal to the number of possible states in which that the object can exist, with each universe containing a unique single possible state of that object. কোনো বস্তু একই সাথে বিভিন্ন অবস্থায় বিভিন্ন মহাবিশ্বে থাকতে পারে (বস্তুর সম্ভাব্য প্রতিটা অবস্থাই, ভিন্ন ভিন্ন অবস্থার সমান সংখ্যক মহাবিশ্বে উপস্থিত থাকবে) এবং সেইসব মহাবিশ্বের মাঝে বিদ্যমান মিথষ্ক্রিয়া প্রতিটা মহাবিশ্বেকেই প্রবেশযোগ্য করবে এবং প্রতিটা মহাবিশ্বকেই একই সাথে প্রভাবিত বা অনুরণিত করবে। স্টিফেন হকিং (Stephen Hawking) এবং রিচার্ড ফাইনম্যান (Richard Feynman) এর মতো বিজ্ঞানীরা এই তত্ত্বের স্বপক্ষে রয়েছেন।

বৈপ্লবিক তিনটি নীতি–

কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সূচনা হয় মূলত চিয়ারত বলবিদ্যার অসারতা থেকে, যখন চিরায়ত বলবিদ্যার সাহায্যে অনেক পরীক্ষা, গবেষনার গাণিতিক ব্যাখ্যা ঠিক মত করা যাচ্ছিল না। এর সূচনা হয় বিশ শতকের গোড়ার দিকে, একই সময় যখন আইনস্টাইন (Albert Einstein) তার আপেক্ষিকতার তত্ত্ব (theory of relativity) প্রকাশ করেন। আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সাহায্যে খুব গতিশীল বস্তুর গতিকে বর্ণনা করা যায় যা পদার্থ বিজ্ঞানের জগতে নতুন এক দিগন্তের উন্মোচন ঘটায়। আপেক্ষিকতার জনক একজন হলেও কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সূচনা ও উন্নয়নে কাজ করেছেন বেশ কিছু বিজ্ঞানী, যাদের হাত ধরেই ১৯০০ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে এই তত্ত্ব শক্ত ভিত গড়ে তোলে।

কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ভিত্তি মজবুত করে মূলত তিনটি নীতি বা প্রিন্সিপাল—

১. কোয়ান্টাইজড বৈশিস্ট (Quantized Properties)- বস্তুর কিছু বৈশিস্ট যেমন অবস্থান, গতি, বর্ণ ইত্যাদি কখনো কখনো কোন নির্দিস্ট সেটের মাঝে পরিবর্তিত হতে পারে, অনেকটা যেন কোনো ডায়াল যেটি একের পর এক সংখ্যাতে ক্লিক করে যাচ্ছে। এ ব্যাপারটি চিরায়ত বলবিদ্যার একেবারে মৌলিক ও প্রাথমিক অনুমানকে (যেখানে বলা হয় বস্তুর উপরোক্ত বৈশিস্ট গুলো হবে সুনির্দিষ্ট) প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। বস্তুর কিছু বৈশিষ্টের এরকম ডায়ালের ক্লিকের মত পরিবর্তনকে বিজ্ঞানীরা নামকরণ করেন কোয়ান্টাইজড।
১৯০০ সালে জার্মান বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্লাঙ্ক (Max Planck) উত্তপ্ত লাল ও উত্তপ্ত সাদা বস্তু (যেমন সাদা বাল্বের ফিলামেন্ট) থেকে নি:সৃত বর্ণালীর বর্ণ বিন্যাস কে ব্যাখ্যা করার জন্য কাজ করছিলেন। তিনি তার সমীকরণ থেকে দেখলেন যে নি:সৃত বর্ণ গুলো হলো পূর্ণসংখ্যা, যা প্রকৃতপক্ষে কিছু প্রাথমিক মানের গুণিতক। যেন সেই বর্ণ বিন্যাস কোয়ান্টাইজড হয়ে গিয়েছে। এটি অপ্রত্যাশিত কারণ আলো যদি তরঙ্গ হয় তবে তার বর্ণ বিন্যাসও হবে অবিচ্ছিন্ন বর্ণালী। অর্থাৎ সেখানে পূর্ণসংখ্যার মাঝের অংশগুলোতেও মান পাওয়া যাবে। কি এমন ব্যাপার ঘটতে পারে যা পরমাণুর মাঝে থেকে পূর্ণসংখ্যার গুণিতকের বাইরের কোনো মান আসতে দিচ্ছে না। প্লাঙ্ক এ কোয়ান্টাইজড ব্যাপারটিকে কোনো গাণিতিক ফাক-ফোকর ধরে নিয়ে তার গবেষণা চালিয়ে গেলেন। সেই সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈপ্লবিক পর্যবেক্ষণ প্লাঙ্ক এড়িয়ে গেলেন। পরবর্তিতে প্লাঙ্ক তার সমীকরণে (Planck’s equation) একটি ধ্রুবক যোগ করেন যেটি ভবিষ্যতে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে। এই ধ্রুবকটি প্লাঙ্কের ধ্রুবক (Planck’s Constant) নামে  পরিচিত।
কোয়ান্টাইজেশন পদার্থবিজ্ঞানের অনেক রহস্য ব্যাখ্যা করতে সহায়তা করেছে। ১৯০৭ সালে কোয়ান্টাইজেশন নিয়ে প্লাঙ্কের হাইপোথিসিস এর সাহায্যে আইনস্টাইন ব্যাখ্যা করেন শুরুর তাপমাত্রা ভিন্ন ভিন্ন থাকলে প্রতিবার একই তাপ দেবার পরও কঠিন বস্তুর তাপমাত্রা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে পরিবর্তিত হয়।

উনবিংশ শতকের শুরুর দিকেই স্পেকট্রোস্কোপির (spectroscopy) বিজ্ঞান আমাদেরকে দেখায় যে ভিন্ন ভিন্ন মৌল ভিন্ন ভিন্ন নির্দিষ্ট বর্ণের আলো শোষণ ও নি:সরণ  করে, যা স্পেক্ট্রাল লাইন (spectral lines) নামে পরিচিত। দূরবর্তী নক্ষত্রের গঠন উপাদান নির্ণয়ের জন্য স্পেকট্রোস্কোপি খুবই কার্যকরী ও নির্ভরযোগ্য একটি পদ্ধতি। বিজ্ঞানীরা শুরুর দিকে এ নিয়ে বেশ দ্বিধায় ছিলেন যে কেন প্রতিটা মৌল ভিন্ন ভিন্ন নির্দিস্ট স্পেক্ট্রাল লাইন উৎপন্ন করে। ১৮৮৮ সালে জোহানেস রিডবার্গ (Johannes Rydberg)  একটি সমীকরণ প্রতিপাদন করেন যেটি হাইড্রোজেন থেকে নি:সৃত স্পেক্ট্রাল লাইন বর্ণনা করে। সমীকরণটি ঠিক হলেও সে সময় কেউই এর পিছনের কারণের যথোপযুক্ত ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। ১৯১৩ সালে নিল্স বোর (Niels Bohr) রাদারফোর্ড (Ernest Rutherford) এর ১৯১১ সালে প্রস্তাব করা পরমাণু মডেলের (এ মডেলে দাবি করা হয়, সৌরজগতে সূর্যের চারিদিকে ঘূর্ণয়মান গ্রহের মতই পরমাণুর অভ্যন্তরে ইলেক্ট্রন, নিউক্লিয়াসের চারদিকে ঘূর্ণনশীল) উপর প্লাঙ্কের কোয়ান্টাইজেশন হাইপোথিসিস প্রয়োগ করেন। বোর প্রস্তাব করেন ইলেক্ট্রন নিউক্লিয়াসের চারদিকে কিছু নির্দিস্ট অরবিট বা অক্ষের মাঝেই সীমাবদ্ধ। ইলেক্ট্রন এক অরবিট থেকে অন্য অরবিটে লাফ দিয়ে যেতে আসতে পারে এবং এই লাফ থেকে নির্গত শক্তিই নির্দিস্ট বর্ণের আলোর নি:সরণ ঘটায়, যা স্পেক্ট্রাল লাইন হিসেবে আমাদের কাছে ধরা দেয়। কোয়ান্টাইজড বৈশিস্ট প্রথমদিকে একটি নিছক গাণিতিক কৌশল থাকলেও এটির সাহায্যে এত কিছুর ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়ে ছিল যে এই নীতি পরবর্তিতে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ভিত রচনা করতে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখে।

২. আলোর কণা (Particles of light)- আলো কখনো কণার মত আচরণ করতে পারে। এই বিষয়টি প্রায় ২০০ বছর ধরে চলা অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, যেখানে বলা হয় আলো হলো তরঙ্গ- এই অনুমানটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বিষয়টি যথেষ্ট আলোচনার জন্ম দেয়। আলোর তরঙ্গ তত্ত্বে বলা হয় আলো অনেকটা কোনো শান্ত লেকের উপরিতলের ঢেউ এর মত, যা কোনো পৃষ্ঠতলে বারি খেতে পারে, কোনায় বাঁক নিতে পারে; তরঙ্গের সম্মিলন উজ্জল আলোর জন্ম দিতে পারে আবার কখনো একে অপরকে লোপ করে  অন্ধকার সৃষ্টি করতে পারে। আলোক উৎসকে তুলনা করা যেতে পারে কোনো লাঠির মাথায় সংযুক্ত কোনো বলের সাথে যেটি ছন্দবদ্ধ ভাবে লেকের মাঝখানে আঘাত করে যাচ্ছে (বিষয়টি সহজ ভাবে বুঝার জন্য এই ভিডিওটি দেখা যেতে পারে)। এই আঘাতের তীব্রতা থেকে নি:সৃত আলোর প্রকৃতি নির্ণয় করা যায়।
১৯০৫ সালে আইনস্টাইন Concerning an Heuristic Point of View Toward the Emission and Transformation of Light নামে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। এখানে তিনি আলোকে তরঙ্গের পরিবর্তে কল্পনা করেন শক্তির কোয়ান্টা (energy quanta) হিসেবে। আইনস্টাইন প্রস্তাব করেন শক্তির এই প্যাকেট উৎসরণ কিংবা নিঃসরণ করে আস্ত ভাবে, কোনো ভগ্নাংশ ভাবে নয়। এবং শক্তির এই পরিবর্তন ঘটে যখন পরমাণু তার কোয়ান্টাইজড কম্পন হারের মাঝে পরিবর্তন ঘটায় ‘লাফ’ (jump) দিয়ে। এই বিষয়টি অনেকটা পরবর্তিতে বোরের পরমাণু মডেলে প্রস্তাব করা কোয়ান্টাইজড অরবিটে ইলেক্ট্রনের লাফ দেবার মতো ঘটনা। আইনস্টাইনের শক্তির এই কোয়ান্টা প্রতিটা লাফের মধ্যে শক্তির যে পরিবর্তন হয় তা সংরক্ষণ করে। আর একে প্লাঙ্কের ধ্রুবক দিয়ে ভাগ করলে পাওয়া যায় সেই কোয়ান্টা থেকে নি:সৃত আলোর বর্ণ।
আইনস্টাইন তার তত্ত্বের সাহায্যে আলোকে পর্যবেক্ষণের এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা করলেন। তিনি প্লাঙ্কের লাইট-বাল্ব ফিলামেন্ট পরীক্ষা থেকে প্রাপ্ত ফলাফলকে নতুন ভাবে ব্যাখ্যা করলেন। এছাড়াও তিনি ফটোইলেকট্রিক ইফেক্ট (নির্দিস্ট বর্ণের আলোর পতনের ফলে ধাতু থেকে ইলেক্ট্রন নি:সরণ) এরও ব্যাখ্যা উপস্থাপন করলেন। এই জন্য তিনি ১৯২১ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

যাইহোক আইনস্টাইন এর গবেষণা পত্রের প্রায় দুই দশক পর শক্তির কোয়ান্টা ফোটন নামে পরিচিতি পেতে শুরু করে। ১৯২৩ সালে বিজ্ঞানী আর্থার কম্পটন (Arthur Compton) এক পরীক্ষার সাহায্যে দেখান যে ইলেক্ট্রন বিম এর মাধ্যমে আলোকে বিক্ষিপ্ত করলে করলে তা বর্ণ পরিবর্তন করে।  এর থেকে খুব সহজেই সিদ্ধান্ত নেয়া যায় যে আলোক কণিকা (ফোটন) বস্তু বা পদার্থের কণিকার সাথে ধাক্কা খাচ্ছে, যা প্রকারন্তরে আইনস্টাইনের অনুমান বা হাইপোথিসিস কে সমর্থন যোগায়। এখন এটি নিশ্চিত যে আলো অবস্থাভেদে কখনো তরঙ্গ আবার কখনো কণা রূপে আচরণ করে। আলোর এই তরঙ্গ-কণা দ্বৈবিধ্য কোয়ান্টাম বলবিদ্যার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।

৩. বস্তুর তরঙ্গ (Waves of matter)- আলো যেমন কখনো কণার ন্যায় আচরণ করতে পারে, তেমনি বস্তু কিংবা পদার্থও কি কখনো তরঙ্গের ন্যায় আচরণ করতে পারে? হ্যা, বস্তুও কখনো তরঙ্গের ন্যায় আচরণ করতে পারে, যা দীর্ঘদিন ধরে চলা অসংখ্য পরীক্ষা ও গবেষণাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে যেখানে বলা হয় বস্তু বা পদার্থ হলো কণিকার (যেমন ইলেক্ট্রন) সমষ্টি।
১৮৯৬ সালে ইলেক্ট্রন আবিস্কারের পর মোটামুটি ধারণা করে নেয়াই হয় যে বস্তু বা পদার্থ কণিকা দ্বারা গঠিত। যদিও আলোর তরঙ্গ-কণা দ্বৈবিধ্য বিজ্ঞানীদের মনে বস্তুর তরঙ্গরূপি আচরণের সম্ভাব্যতা নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দেয়। এই ধারণাটি নিয়ে সর্বপ্রথম এগিয়ে আসেন ফরাসি পদার্থবিদ ডি ব্রগলি (Louis de Broglie). ১৯২৪ সালে ব্রগলি আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের (theory of special relativity) সাহায্যে দেখান যে কণা বা কণিকা তরঙ্গের মত বৈশিষ্ট দেখাতে পারে, আবার কখনো তরঙ্গ কণার ন্যায় আচরণ করতে পারে। অতঃপর ১৯২৫ সালে পৃথক পৃথক ভাবে কাজ করা এবং আলাদা গাণিতিক পথ অবলম্বন করা দুইজন বিজ্ঞানী পরমাণুর অভ্যন্তরে ইলেক্ট্রনের ঘূর্ণন সম্পর্কিত একটি সমস্যার (এটি চিরায়ত বলবিদ্যার সাহায্যে ব্যাখা করা যাচ্ছিল না) ব্যাখা প্রদানে ব্রগলির যুক্তি ব্যবহার করেন। জার্মান পদার্থবিদ হাইজেনবার্গ (Werner Heisenberg) (তার সাথে আরও ছিলেন বিজ্ঞানী ম্যাক্স বর্ন ও পাসকেল জর্ডান) এই কাজ করতে যেয়ে ম্যাট্রিক্স মেকানিক্স (matrix mechanics) এর সূচনা ঘটান। আর অপরদিকে অস্ট্রিয়ান পদার্থবিদ শ্রুডিঞ্জার (Erwin Schrödinger) তরঙ্গ বলবিদ্যা (wave mechanics) নামে কাছাকাছি আর একটি তত্ত্বের উৎপত্তি ঘটান। শ্রুডিঞ্জার পরে ১৯২৬ সালে দেখান যে এই দুটি পদ্ধতিই সমগোত্রীয় এবং সমতুল্য (অবস্য সুইস পদার্থবিদ উলফগ্যাং পাউলি এর মতে ম্যাট্রিক্স মেকানিক্সই বেশি সম্পূর্ণ ও সমৃদ্ধ).
যাইহোক হাইজেনবার্গ-শ্রুডিঞ্জার এর পারমানবিক মডেল বোর-রাদারফোর্ড এর মডেলকে প্রতিস্থাপিত করে, যেখানে নিউক্লিয়াস এর চারদিকে ইলেক্ট্রনকে তরঙ্গ (এটি ইলেক্ট্রন ক্লাউড নামেও পরিচিত) রূপে চিহ্নিত করা হয়। তবে এই ইলেক্ট্রন গঠনকারি তরঙ্গের দুটি প্রান্ত অবশ্যই একে অপরের সাথে সংযুক্ত থাকতে হবে। এই শর্তের একটি অনুসার হলো তরঙ্গের উচ্চ ও নিম্ন মুখী অংশগুলি পূর্ণসংখ্যা হবে, যার সাহায্যে কিছু কোয়ান্টাইজড বৈশিস্টর ব্যাখা প্রদান সম্ভব হয়েছিল।  হাইজেনবার্গ-শ্রুডিঞ্জার পারমানবিক মডেলে ইলেক্ট্রন তরঙ্গ ফাংশন (wave function) অনুসরণ করে এবং এখানকার অরবিটকে অরবিটাল (orbital) নামে  ডাকা হয়। অরবিট যেখানে কেবল বৃত্তাকার ছিল সেখানে এই অরবিটাল গুলো গোলকাকৃতি, ডাম্বেলাকৃতি ইত্যাদি বিভিন্ন রকম হতে পারে।

ওয়াল্টার হেইটলার (Walter Heitler) এবং ফ্রিট্জ লন্ডন (Fritz London) ১৯২৭ সালে তরঙ্গ বলবিদ্যার আরও উন্নয়ন সাধন করেন।  তারা দেখান কিভাবে পরমাণু অরবিটাল গুলো একত্রিত হয়ে অণুর অরবিটাল গঠন করে এবং কিভাবে বিভিন্ন পরমাণু একে অপরের সাথে সংযুক্ত হয়ে অণু সৃষ্টি করে। এই ব্যাপারগুলো চিরায়ত বলবিদ্যার সাহায্যে তখন ব্যাখ্যা করা সম্ভব হচ্ছিল না। এইসব কর্মকান্ড ও গবেষণাই কোয়ান্টাম কেমিস্ট্রির সূচনা করে।

অনিশ্চয়তার নীতি (The Uncertainty Principle)–

১৯২৭ সালে হাইজেনবার্গ কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার গবেষণায় আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তার যুক্তি অনুসারে, যেহেতু বস্তু তরঙ্গের ন্যায় আচরণ করতে পারে, তাই এর কিছু বৈশিস্ট যেমন অবস্থান, গতি হবে সম্পূরক অর্থাৎ এই বৈশিস্ট গুলো পুরোপুরি স্পষ্ট ভাবে নির্ণয়ে একটি সীমারেখা থাকবে। অর্থাৎ আমরা কখনোই এই বৈশিস্ট গুলো সম্পূর্ণ নিখুত ও সঠিক ভাবে নির্ণয় করতে পারব না। এই বিষয়টিকেই বলা হয় হাইজেনবার্গ এর অনিশ্চয়তার নীতি। এই নীতি অনুসারে আমরা যতোটুক সূক্ষ্যভাবে ইলেক্ট্রন এর অবস্থান নির্ণয় করবো, ইলেক্ট্রন এর গতি নির্ণয় ঠিক ততোটাই অনিশ্চিত হয়ে যাবে। বিপরীতভাবেও একই কথা প্রযোজ্য। অর্থাৎ গতি নির্ণয় করলে আমরা অবস্থান জানবো না আবার অবস্থান নির্ণয় করতে গেলে আমরা গতি জানতে পারব না। এই অনিশ্চয়তার নীতি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যদিও আমরা এটি লক্ষ্য করি না কারণ এখানে হিসাবের পার্থক্য খুবই কম বা সূক্ষ্য। যেমন আমরা যদি একটি বেসবল এর গতি ঘন্টায় ০.১ মাইল পর্যন্ত নিখুত ভাবে মাপতে পারি তবে এর অবস্থান ০.০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০৮ মিলিমিটার পর্যন্ত নিখুত ভাবে গণনা করা সম্ভব হবে।

অতঃপর…….

কোয়ান্টাইজেশন, তরঙ্গ-কণা দ্বৈবিধ্য এবং অনিশ্চয়তার নীতি কোয়ান্টাম বলবিদ্যার জন্য এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার এই জ্ঞান বৈদ্যুতিক ও চৌম্বক ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে ১৯২৭ সালে পল ডিরাক (Paul Dirac) quantum field theory (QFT) নামে নতুন এক শাখার উত্থান ঘটান। দশক ধরে QFT এর গবেষণা চলবার পর বিজ্ঞানীরা নতুন বাধার সম্মুখীন হয়। QFT এর অনেক সমীকরণে অদ্ভুত উত্তর আসা শুরু করে যার বাস্তব অর্থউদ্ধার কঠিন হয়ে দাড়ায়।  এইসব সমীকরণের অনেকগুলাতেই ফলাফল আসে অসীমতায় (infinity). এই বাধা উত্তরণের জন্য ১৯৪৭ সালে হান্স বেথ (Hans Bethe) renormalization নামে এক কৌশল অনুসরণ করেন। ‘ইলেক্ট্রন স্বশক্তি’ (electron self-energy) এবং ‘শুন্য সমবর্তন’ (vacuum polarization) সম্পর্কিত  সমস্যা গুলো সমাধানে এই পদ্ধতি কাজে লাগে।

আর এই renormalization পদ্ধতি কোয়ান্টাম তত্ত্বের পরবর্তী উন্নয়ন ও চারটি মৌলিক বল- তড়িৎচুম্বক বল (electromagnetic force ), দূর্বল নিউক্লিয়ার বল (weak nuclear force), সবল নিউক্লিয়ার বল (strong nuclear force) ও অভিকর্ষ বল (gravity) নিয়ে গবেষণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ১৯৪০-৫০ এর দিকে QFT কোয়ান্টাম বৈদ্যুতিক গতিবিদ্যার (Quantum Electrodynamics- QED) সাহায্যে তড়িৎচুম্বক বলের নতুন ধারণা প্রদান করে। পরবর্তিতে ষাট এর দশকে দুর্বল নিউক্লিয়ার বলের ব্যাখ্যা এবং এর সাথে তড়িৎচুম্বক বলের সমন্বয়ে Electroweak Theory (EWT) এর বিকাশ ঘটে। প্রায় একই সময়ে Quantum Chromodynamics (QCD) এর মাধ্যমে সবল নিউক্লিয়ার বলেরও কোয়ান্টাম ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হয়। আধুনিক কণা পদার্থবিজ্ঞানের (particle physics) স্ট্যান্ডার্ড মডেলের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে এই QED, EWT, QCD তত্ত্বগুলো। অপেক্ষা এখন শুধু অভিকর্ষ বলকে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সাহায্যে ব্যাখ্যা করার। আর এই অনুসন্ধান চলছে স্ট্রিং তত্ত্ব (String Theory) এবং loop quantum gravity এর গবেষণার মাধ্যমে। কোয়ান্টাম বলবিদ্যা ও কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার এই গবেষণা চলবে এবং কোয়ান্টাম অপটিক্স, কোয়ান্টাম কেমিস্ট্রি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি ইত্যাদি নতুন নতুন ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটাবে।

[এই লেখাটি জিরো টু ইনফিনিটির মার্চ ২০১৫ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে]